নমস্কার কি? শাস্ত্র মতে অভিবাদনের জন্য কী ব্যবহার করা উচিত?
এই লেখা থেকে আপনাদেরকে নিচের প্রশ্ন গুলোর উত্তর শাস্ত্রের আলোকে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
১. নমস্কার কি?
২. কাকে নমস্কার দেওয়া যায়?
৩. নমস্কার কোথা থেকে আসলো?
৪. নমস্কার বলা উচিত নাকি জয় রাধে, জয় গুরু বলা বলা উচিত?
বৈদিক ও শাস্ত্রীয় পরম্পরায় ‘মুদ্রা’ বলতে হাত বা দেহের একটি নির্দিষ্ট প্রতীকী ভঙ্গিকে বোঝানো হয়। ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রে মোট ২৪ প্রকার অসংযুক্ত হস্তমুদ্রার বিবরণ পাওয়া যায়, যার মধ্যে দুই হাত জোড় করে ধারণ করা বিশেষ মুদ্রাটির নাম ‘অঞ্জলি মুদ্রা’।
কাউকে দেখলে অভিবাদন জানাতে যখন এটি ব্যবহারকরা হয় তখন একে বলা হয় নমস্কার। আবার বৈদিক সান্ধ্য উপাসনার শেষধাপে যখন ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে এই মুদ্রা করা হয় তখন একে বলে প্রনাম-আসন যা ভক্তি ও আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘নমস্তে’ শব্দটি মূলত সংস্কৃত ‘নমঃ’ ও ‘তে’ থেকে গঠিত, বাংলায় এর প্রচলিত রূপ হলো ‘নমস্কার’।
নমস্তে শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে—
নমঃ (नमः) = নত হওয়া, প্রণাম, বিনয়
তে (ते) = তোমাকে
অর্থাৎ, তোমার প্রতি শ্রদ্ধা রইলো বা আমি তোমাকে প্রণাম করছি।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে “নমস্তে” কেবল একটি অভিবাদন নয়, বরং একটি দর্শন। এর ভাবার্থ এভাবে করা যায়,
“আমার ভিতরের আত্মা তোমার ভিতরের আত্মাকে প্রণাম জানাচ্ছে।”
অথবা
“আমার মধ্যে যে ঈশ্বরত্ব, তা তোমার মধ্যেও বিদ্যমান—আমি তাকে সম্মান জানাই।”
ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরের ভাস্কর্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্রসহ বিভিন্ন দেবদেবী ও মানবাকৃতির ব্যক্তিত্বকে নমস্কার বা প্রণামের ভঙ্গিতে উপস্থাপিত অবস্থায় খচিত নকশা পাওয়া যায়। বৈদিক গৃহ্যসূত্রসমূহ, যেমন আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র ও বৌধায়ন গৃহ্যসূত্রে, অভিবাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি হিসেবে নমস্কার প্রদানের বিধান উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের বিভিন্ন মন্ত্রে ‘নমঃ’ বা ‘নমস্তে’ শব্দের মাধ্যমে দেবতাদের প্রতি প্রণাম ও শ্রদ্ধা নিবেদনের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে নমস্কার প্রথা প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
"নমো জ্যেষ্ঠায় চ কনিষ্ঠায় চ
নমঃ পূর্বজায় চাপরজায় চ
নমো মধ্যমায় চাপগল্ভায় চ
নমো জঘন্যায় চ বুধ্ন্যায় চ ।। "
— যজুর্বেদ ১৬.৩২
অনুবাদ- নমস্কার জ্যেষ্ঠদের প্রতি, নমস্কার কনিষ্ঠদের প্রতি; নমস্কার পূর্বজ (আগে জন্মগ্রহণকারী) ও অপরজ (পরে জন্মগ্রহণকারী) সকলের প্রতি; নমস্কার মধ্যম অবস্থানকারীদের প্রতি এবং শক্তিশালী বা সক্ষমদের প্রতি; নমস্কার নিম্নস্তরের ও ভিত্তিস্থ (সাধারণ/মূল স্তরের) সকলের প্রতিও।
এই মন্ত্রে সমাজের বিভিন্ন স্তর, বয়স ও অবস্থানের মানুষের প্রতি সমানভাবে ‘নমঃ’ অর্থাৎ প্রণাম নিবেদনের কথা বলা হয়েছে। এখানে জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ, পূর্বজ-অপরজ, মধ্যম ও নিম্নস্তরের সকলের প্রতিই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে বৈদিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নমস্কার একটি সর্বজনীন অভিবাদন, যেখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান বা মর্যাদার ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। এই কারণেই বৈদিক ঋষিগণ পরস্পরকে এবং সকলের প্রতি নমস্কারের মাধ্যমে সম্মান ও বিনয় প্রকাশ করতেন।
রামায়ণ ও মহাভারতে দেখা যায় যে শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের যুগে অভিবাদনের প্রধান রীতি ছিল প্রণাম বা নমস্কার, যা ‘নমঃ’, ‘নমস্কৃত্য’ বা ‘প্রণিপত্য’ প্রভৃতি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তারা নিজেরাও এভাবে অভিবাদন করতেন। শাস্ত্রে কোথাও শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক তাঁর ভক্তদের অভিবাদনের ক্ষেত্রে নমস্কার পরিত্যাগ করে নির্দিষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। বর্তমানে হিন্দু সমাজের একটি অংশে অভিবাদনের ক্ষেত্রে নমস্কারের পরিবর্তে ‘হরে কৃষ্ণ’, ‘জয় রাধে’, ‘জয় গুরু’ প্রভৃতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ঈশ্বর সবাইকে আলোর পথ দেখান।
ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী ১৯৩৩ সালে আমেরিকার শিকাগোতে আয়োজিত World Fellowship of Faiths সম্মেলনে ভারতীয় ঐতিহ্য ও হিন্দু দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সেখানে বিভিন্ন ধর্মভাগের সম্মানিত প্রতিনিধিদের সামনে তাঁর চিন্তা ও দর্শন তুলে ধরেছিলেন। জানা যায় সেখানে তিনি 'নমস্কার' বলে সম্ভোধন করেছিলেন এবং এর ব্যাখ্যা হিসেবে ইংরেজিতে বলেছিলেন, “With head and heart I salute the God in you”

Join the conversation